প্রস্রাব ইনফেকশনের কেন হয়, লক্ষণ, চিকিৎসা ও সমাধান

প্রস্রাবে ইনফেকশন বা ইউরিন ইনফেকশন খুব সাধারণ একটি সমস্যা। পুরুষদের তুলনায় মেয়েরা এই রোগে বেশি ভোগে। এক জনের টাকা আরেক জনের কাছে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা টাকার গন্ধ পেলে ময়লা হাতে হোক বা ময়লা সহ হোক নিতেই সর্বদা প্রস্তুত।
কিন্ত কথা হচ্ছে, একই টাকা একেকজনের হাত ঘুরে আরেকজনের হাতে যাচ্ছে। ময়লা আর্বজনায় পড়ে যাওয়া টাকা আবার ফিরে আসছে হাতে হাতে। এসব টাকায় রয়েছে ‘ই-কোলাই’ ও ‘ফেকাল কলিফর্ম’ জাতীয় ব্যাকটেরিয়া, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রস্রাবে ইনফেকশনের কারণ

আমাদের প্রতিটি মানুষের শরীরের দুটি কিডনি, দু’টি ইউরেটার, একটি ইউরিনারি ব্লাডার (মূত্রথলি) এবং ইউরেথ্রা (মূত্রনালি) নিয়ে মূত্রতন্ত্র গঠিত। আর এই রেচনন্ত্রের যে কোনও অংশে যদি জীবাণুর সংক্রমণ হয় তাহলে সেটাকে ‘ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন’ বলা হয়।
প্রস্রাবের রাস্তায় কোনো বাধা থাকলে (যেমন টিউমার, পাথর, প্রস্টেট গ্ল্যান্ড), অনেকক্ষণ প্রস্রাব ধরে রাখলে, পানি কম খেলে, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখলে, প্রস্রাবের ইনফেকশন হতে পারে। কোনো কারণ ছাড়াও হতে পারে। বৃহদান্ত্রে বাস করা ব্যাক্টেরিয়াগুলো প্রস্রাবের রাস্তায় এসে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
পুরানো টাকা থেকে প্রস্রাবে ইনফেকশন

কিডনি, মূত্রনালি, মূত্রথলি বা একাধিক অংশে একসঙ্গে এই ধরণের সংক্রমণ হতে পারে। এই সংক্রমণকেই সংক্ষেপে ইউরিন ইনফেকশন বলা হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অনার্সের শেষ বর্ষের ছাত্রী নিশাত তাসনিমের এক গবেষণায় ময়লা টাকা নিয়ে এসব তথ্য উঠে আসে।
গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘স্টাডি অন দ্যা ব্যাকটেরিয়াল কন্টামিনেশন অন পেপার মানি অ্যান্ড কয়েনস অব খুলনা সিটি এরিয়া’। ছয় মাস ধরে নগরীর ১৫টি উৎস থেকে ময়লা টাকা ও কয়েন সংগ্রহ করে তা ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় মাংস, মাছ ও মুরগি বিক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া টাকায় সবচেয়ে বেশি ব্যাকটেরিয়া ও মলের জীবাণু পাওয়া যায়। অন্য ১২টি উৎস থেকে নেওয়া টাকার নোট এবং কয়েনেও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের গবেষণা সুপারভাইজার অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘টাকা ছাড়া প্রাত্যহিক জীবন অচল। অথচ সেই টাকাই আমাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। টাকা ধরে হাত না ধুয়ে খাবার খেয়ে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’ শিগগিরই এ বিষয়ে আরও বড় পরিসরে এক বছর ধরে আরেকটি গবেষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এই গবেষণার ব্যাপারে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এসএম কামাল বলেন, ‘টাকায় বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু থাকে। মাঝেমধ্যে দেখা যায় টাকা মাটিতে, ময়লার মধ্যে কিংবা ড্রেনে পড়ে যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেই টাকা শুকিয়ে আবার তা ব্যবহার করেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় টাকার নোট ও কয়েনে যে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, তা মলের মধ্যে থাকে। টাকায় যে ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, তা পেটে গেলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া প্রস্রাবের ইনফেকশনও হতে পারে।’
গবেষণায় দেখা গেছে, মাংসের দোকান থেকে সংগ্রহ করা টাকার নোটে সর্বাধিক ২৬৭০টি ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া, মাছ বিক্রেতার টাকায় ২৬০০, মুরগি বিক্রেতার টাকায় ২৩০০ ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া এবং মাছ ও মুরগি বিক্রেতার টাকায় ২৮০০ এবং মাংসের দোকানের টাকায় ২৬০০ ফেকাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়।
অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা টাকায়ও এ দুটি ব্যাকটেরিয়া মিলেছে, তবে সেগুলো ১০০০-এর নিচে রয়েছে।
এছাড়া মাছ বিক্রেতার দোকান থেকে সংগ্রহ করা কয়েনে ২৬০০ ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া, মুরগির দোকানের কয়েনে ২৪৮০, জুস বিক্রেতার কয়েনে ২৬০০, মাংসের দোকানের কয়েনে ২১৩০, পথ খাবারের দোকানের কয়েনে ১৭৯০ ও ফুচকার দোকানের কয়েনে ১২৫০ ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়।
মুরগির দোকানের কয়েনে ২৯০০, মাছ বিক্রেতার কয়েনে ২৮০০, মাংস বিক্রেতার কয়েনে ২৬৬০, ফল বিক্রেতার কয়েনে ২০৬০, পথ খাবারের দোকানের কয়েনে ১৫৭০, ফুচকা বিক্রেতার কয়েনে ১৪৬০, সাধারণ মানুষের কয়েনে ১২০০, ভিক্ষুকের কয়েনে ১০৮০ ফেকাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়।
অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা কয়েনেও এ দুটি ব্যাকটেরিয়া মিলেছে, তবে সেগুলো ১০০০ এর নিচে।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. পার্থ প্রতীম দেবনাথ জানান, এক হাজারের বেশি পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। সুত্র:বাংলাটিবিউন
প্রস্রাবে ইনফেকশন কেন হয়

সাধারণত আমাদের বৃহদন্ত্রে অবস্থিত ই.কোলাই ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণে এই ইনফেকশন হয়ে থাকে। তবে অন্যান্য ব্যাক্টেরিয়াও এর জন্য দায়ী হতে পারে যেমন প্রোটিয়াস ইত্যাদি।
কিছু কিছু পরজীবীও এই ইনফেকশন ছড়িয়ে থাকে। আবার অনেক সময় আক্রান্ত রোগীর দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণেও এ ধরণের ইনফেকশন হতে পারে যখন শরীর সাধারণ ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণ ঠেকানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে।
পুরুষের ক্ষেত্রে আমাদের প্রোস্টেট গ্রন্থি রয়েছে। সেই প্রোস্টেট গ্রন্থি যখন বড় হয়ে যায়, তখন প্রস্রাবের রাস্তায় বাধাপ্রাপ্ত হয়।
আজকাল যে ওষুধ বেরিয়েছে, সেটিতে কিন্তু ঠিক করে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা রয়েছে। আর মেয়েদের যেহেতু প্রস্রাবের রাস্তা সরু, সে ক্ষেত্রে তাদের যদি এ ধরনের সমস্যা হয়, সেটা মেরামত করা একটু কষ্টজনক। তবুও যেসব ওষুধ, সেগুলো সমস্যার অনেকটা ব্যবস্থাপনা করে।
যারা ডায়াবেটিসে ভোগে, তাদের নিউরোজেনিক ব্লাডার তৈরি হয়, নিউরোজেনিক ফাংশন ঠিকমতো করে না। সঠিকভাবে কাজ না করতে পারলে প্রস্রাব ঝড়ার প্রবণতা বাড়ে। অথবা প্রস্রাবটা ব্লাডারে থেকে যায়। একে আমরা বলি রিটেনশন অব ইউরিন বা ইনকনটিনেন্স অব ইউরিন।
ইউরিন বা প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ

- প্রস্রাবে দুর্গন্ধ।
- প্রস্রাব গাঢ় হলুদ বা লালচে হওয়া।
- প্রস্রাব করার সময় জ্বালা বা ব্যথা করা।
- একটু পর পর প্রস্রাবের বেগ অনুভব করলেও ঠিক মতো প্রস্রাব না হওয়া।
- তলপেটে বা পিঠের নিচের দিকে তীব্র ব্যথা করা।
- বমি ভাব বা বমি হওয়া।
- প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া।
- প্রচুর ঘাম হওয়া।
- প্রস্রাবের চাপ তীব্রতর ভাবে আসা।
- সারাক্ষণ জ্বর জ্বর ভাব বা কাঁপুনি দিয়ে ঘন ঘন জ্বর আসা।
ইউরিন ইনফেকশন চিকিৎসা

ইউরিন ইনফেকশনের কিছু ঘরোয়া প্রতিকার বা চিকিৎসা আছে যে গুলো মেনে চললে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। একটি ইউরিনারি ব্লাডার (মূত্রথলি) এবং ইউরেথ্রা (মূত্রনালি) নিয়ে মূত্রতন্ত্র গঠিত। আর এই রেচনন্ত্রের যে কোনও অংশে যদি জীবাণুর সংক্রমণ হয় তাহলে সেটাকে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বলা হয়।
প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে করণীয়
- নিয়মিত ও পরিমিত পানি পান করা
- প্রস্রাব আটকে না রাখা
- প্রস্রাবের পর যথেষ্ট পানি ব্যবহার করা
- শারীরিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা
- পরিচ্ছন্ন অন্তর্বাস পরিধান করা
- শারীরিক মিলনের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।
0 Comments